তিনদিনের সরকারি সফরে ঢাকায় অবস্থান করছেন ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী অরুণ জেটলি। মঙ্গলবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত শুধু অভিন্ন সীমান্ত ও নদী দিয়ে নয়; সভ্যতা ও সংস্কৃতি দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ। বর্তমানে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেক বেশি সংহত। এর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে আবেগ।’ অরুন জেটলি বলেন, ভারত একটি বড় বাজার। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যেকোনো খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে তাদের পক্ষ থেকে তাতে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে। এ কথা সত্য রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে আরো উন্মুক্ত অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে দেশটি। তার পরও কিছু ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মনোভাব রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক অন্যমাত্রায় উন্নীত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি বেশ এগিয়েছে। তবে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের আমদানিতে। এ কারণে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে। ভারত তার বাজারে বাংলাদেশকে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। তবে অশুল্ক ও প্যারা ট্যারিফ বাধার কারণে ভারতের বাজারের সুযোগটি আমরা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছি না। বাংলাদেশের পণ্যের ওপর কখনো কাউন্টারভেলিং শুল্ক, কখনো আবার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসানো হয়। এ বাধা অপসারণে ভারত সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। উভয় দেশ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী। পুরনো রেললাইনগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন রেললাইনও তৈরি করা হচ্ছে। সড়ক অবকাঠামোয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। উপকূলীয় জাহাজ দিয়ে স্থানীয় জাহাজের মতো বাণিজ্য শুরু হয়েছে। বাস যোগাযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে ভারত। এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের পাটপণ্য রফতানিকারকরা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণে চারটি বাধার কথা বলা হয়েছিল একটি সেমিনারে। ব্যবসায়ীদের ওপর সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখিত বাধাগুলো হলো— অবকাঠামো দুর্বলতা, শুল্ক ও বন্দর-সংক্রান্ত অসুবিধা, অশুল্ক বাধা এবং ঝামেলাপূর্ণ রফতানি প্রক্রিয়া। ভারতের অর্থমন্ত্রীর এ সফর ফলপ্রসূ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমরা চাইব, এ সময়েই ভারতের বাণিজ্য প্রতিবন্ধক অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি মিলবে। এ কথাও সত্য, প্রতিশ্রুতি দিলেই ভারত সবকিছু পূরণ করে না। দেশটির আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্যাচে পড়ে অনেক ভালো উদ্যোগও হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ক্রমেই উন্নতি করছে এবং আরো সম্ভাবনা রয়েছে এগিয়ে যাওয়ার। সেক্ষেত্রে তিনদিক বেষ্টিত ভারতের সহায়তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং সুযোগ রয়েছে অনেক।
অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি সুসংবাদ। এ প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে সব প্রতিবেশী দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশকেও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশকেও ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ধারাকে বুঝতে হবে এবং এ প্রক্রিয়ায় ক্রিয়াশীল সব শক্তির সঙ্গে সমন্বয় ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামোকে আরো বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাদার সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ভারতনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া। বলা বাহুল্য, আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বিষয়টি ভাবাবেগ দ্বারা পরিচালিত নয়, বরং এটি একটি গভীর স্বার্থের বিষয়। এখানে প্রয়োজনে ছাড় দিতে হবে, প্রয়োজনে কূটনৈতিকভাবে দরকষাকষি করে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এজন্য দরকার একটি সামাজিক কূটনৈতিক বাতাবরণ ও কাঠামো তৈরি করা।








